পর্বত পাশ কাটিয়ে তার শীর্ষ ছোয়া যায় না

আমরা সবাই সফলতা চাই। সফল মানুষগুলোকে দেখি, আমাদের ভাল লাগে। মনে মনে ভাবি তাদের মত যদি হতে পারতাম! এই মনে মনে ভাবা মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশী। তার চেয়ে কম সংখ্যক কিছু মানুষ তাতেই থেমে থাকেন না। তাঁরা জানার চেষ্টা করেন এই সফল ব্যাক্তিরা কী উপদেশ দিয়েছেন বাকীদের জন্য। সেসব উপদেশ শুনে নিজেকে উত্সাহিত করার চেষ্টা করেন তাঁরা। তবে তাঁরা হাল ছেড়ে দেন সহজেই। সবাইকে অনুসরণ করতে গিয়ে তাঁরা নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে বসেন। একসময়ে আর চেষ্টা করতে ভালো লাগে না।

আর অনেক অনেক কম সংখ্যক মানুষ নিজের দিকে আগে তাকান, তাঁরা ভেবে বের করেন নিজে কী করতে পছন্দ করেন। সেসব পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে কোনটি তাঁরা সবচেয়ে ভালভাবে করতে পারেন, সেটিও তাঁরা খুজে বের করেন। বিভিন্নভাবে দিনের পর দিন চেষ্টা করেন তাঁদের কাজগুলো নিয়ে, যতদিন পর্যন্ত না সেগুলো মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়। তাঁরা মেনে নেন যে, এই চেষ্টা এবং পথচলা অনেক দিন ধরে চলবে এবং মরুভূমিতে পানির দেখা হয়তো মিলবে না অনেক অনেক দিন। মাঝে মাঝে ছোট পানির ফোয়ারা দেখা যাবে কিন্তু আবার মরিচিকার মত হারিয়ে যাবে। মাঝে মাঝে দু এক ফোঁটা বৃষ্টি হবে কিন্তু ঝড়ের প্রতাপে তাও উপভোগ করা যাবে না।

কিন্তু তাঁরা একটি ব্যাপার ভালভাবেই জানেন – সামনের দিকে এগিয়ে না গেলে গন্তব্য নিজ থেকে এসে ধরা দেবে না।

নতুন জেনারেশন নিয়ে আমাদের সবার আক্ষেপের কোনও শেষ নেই। এদের এই সমস্যা, ওই সমস্যা। কিন্তু কেউ কখনো এটা স্বীকার করেন না যে, এদের এতো সমস্যার পেছনে রয়েছে খামখেয়ালি প্যারেন্টিং। ছোটবেলা থেকে যদি কাউকে এটা বার বার মনে করিয়ে দেয়া না হয় যে, জীবনে কিছু চাইলেই তা পাওয়া যায় না, বরং সেটার জন্য কাজ করতে হয়, মাথা খাটাতে হয়, তাহলে তাদের পক্ষে নিজেদের ক্ষমতা যাচাই এবং সেটার ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়ে। আপনাকে আপনার বাবা-মা যদি জীবনের কঠিন দিকগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে না দিয়েই বড় করে দেন, তাহলে আপনি কোন বিশ্বসেরা ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করে বের হয়েছেন সেটা খুব একটা অর্থ বহন করে না।

এভাবে বেড়ে ওঠা ছেলে-মেয়েরা যখন কর্পোরেট এনভায়রনমেন্ট-এ এসে পড়ে, সেখানে তাদের কে দেখতে হয় অন্য এক লীলাখেলা। কর্পোরেট কালচার তাদেরকে বলতে থাকে – “তুমি যদি এই মাসের মধ্যে এই টারগেট মিট না করতে পার তাহলে তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।” কিংবা, “এই বছরের শেষে যদি তোমার কেপিআই স্কোর এতো না থাকে তাহলে তোমার প্রোমোশন কিংবা স্যালরি বৃদ্ধি তো দূরের কথা, নতুন চাকরি খুজতে বের হতে হবে হয়তোবা।” তারা যখন চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যায় তখন আমরা চিন্তা করি, কী কারণে তারা এতো frustrated! কিন্তু এটা ভেবে বের করার চেষ্টা করি না, তাদেরকে কীভাবে যুগোপযোগী করে তোলা যায়। তাদের বাবা-মা যেহেতু ব্যর্থ হয়েছেন তাদেরকে সঠিক শিক্ষা দিতে, তাহলে আমাদেরকেই এখন চেষ্টা করতে হবে নতুন চাকরি করতে আসা এইসব বাচ্চা ছেলেমেয়েদেরকে কর্পোরেট এনভায়রনমেন্ট-এর সাথে খাপ খাওয়ানোতে সাহায্য করা।

যাদেরকে ছোটবেলা থেকে শুধুই পাহাড়ের শীর্ষ দেখানো হয়েছে, তাদেরকে পাহাড় চড়তে শেখানো কর্পোরেট জায়ান্টদের কর্তব্য।

পাহাড় চড়তে না চেয়েই শীর্ষে পৌছানোর চেষ্টা করা কিংবা আশা করা যে, কেউ তাদেরকে সেখানে পৌছে দেবে, ঠিক যেমন ছোটবেলা থেকে ‘চাহিবামাত্র সবকিছু পাওয়া গিয়েছে’ – এটা যে শুধু এই জেনারেশনের সমস্যা তা নয় মোটেও। তার আগের জেনারেশনের অনেকের মধ্যেই এই ব্যাপার দেখা যায়। আমাদের সবারই মনে রাখতে হবে যে, এই পৃথিবীতে কেউ কখনো পাহাড় না চড়ে, উত্‍রাই না পার হয়ে, ঘাম না ঝরিয়ে পাহাড়ের শীর্ষে পৌছেনি। হেলিকপ্টার দিয়ে হয়তো পৌছে যাওয়া যায়, তবে সেটা করতে হলে হয় আপনার নিজের হেলিকপ্টার থাকতে হবে, নাহলে সেটা ভাড়া নেবার ক্ষমতা থাকতে হবে, কিংবা আপনার বাবার হেলিকপ্টার থাকতে হবে। এর কোনটাই যদি না থাকে, তাহলে পাহাড় চড়বার মানসিকতা তৈরী করুন এখনই।

[সাইমন সিনেকের একটি টকশো অবলম্বনে]